Campus Pata 24
ঢাকাTuesday , 28 May 2024
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. ক্যাম্পাস
  5. খেলাধুলা
  6. চাকরির খবর
  7. জাতীয়
  8. তথ্যপ্রযুক্তি
  9. বিনোদন
  10. ভ্রমণ
  11. মতামত
  12. রাজনীতি
  13. লাইফস্টাইল
  14. শিক্ষা জগৎ
  15. সারাদেশ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ভাবমূর্তির সঙ্কট

Link Copied!

জাতীয় সংসদ বাংলাদেশের সকল কর্মকান্ডের প্রাণকেন্দ্র। মন্ত্রিসভা সম্মিলিতভাবে জাতীয় সংসদের কাছে দায়বদ্ধ থাকে। সরাসরি ভোটে নির্বাচিত ৩০০ এবং নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনের ৫০ মিলিয়ে ৩৫০ সদস্য নিয়ে জাতীয় সংসদ গঠিত। এই ৫০ জন আসলে সরাসরি সরকারে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করেন। তারা দেশের স্বার্থে আইন প্রণয়ন করেন, নীতিনির্ধারণ করেন। সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করেন।

মাননীয় সংসদ সদস্যগণ তাই মর্যাদার অতি উচ্চ আসনে আসীন। কিন্তু সবসময় সব সংসদ সদস্য মর্যাদার এই আসনটি ধরে রাখতে পারেন না। তারা নিজেরা মর্যাদার আসন থেকে নেমে এসে স্থানীয় সরকারে নানা কাজে কর্মে হস্তক্ষেপ করেন। যাদের ব্যস্ত থাকার কথা পদ্মা সেতু নিয়ে, তারা নাক গলান কালভার্টে, গ্রামীণ সড়কে, গম ভাগাভাগিতে। এসব কাজ তাদের না হলেও শেষ পর্যন্ত তা জনগণের কাজেই লাগে। কিন্তু সংসদ সদ্যদের অনেকেই স্থানীয় টেন্ডার, বালুমহাল, গরুর হাট, বাসস্ট্যান্ড, টেম্পোস্ট্যান্ড, বাজার- সবকিছুই দখল করে নেন। সেখান থেকে নিয়মিত চাঁদা তোলেন। নিজ নিজ এলাকায় একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করেন। বিরোধী দল তো বটেই, এমনকি নিজ দলের প্রতিপক্ষরাও মুখ খুলতে পারেন না। আর এই আধিপত্য বজায় রাখতে খুন-খারাবি, মারামারিতেও জড়িয়ে পড়ে মাননীয় সংসদ সদস্যদের নাম। তখন আর তাদের মাননীয় বলা যায় না। তবে কোনো কোনো সংসদ সদস্য মাদক চোরাচালান, স্বর্ণ চোরাচালান, অস্ত্র চোরাচালান, হুন্ডির মত বড় অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়েন। যা সামগ্রিকভাবে আমাদের লজ্জিত করে।

সম্প্রতি কলকাতায় গিয়ে ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম আনারের নিখোঁজ হওয়া এবং মৃত্যুর খবর নিয়ে দেশে-বিদেশে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। তোলপাড় হওয়ারই কথা। এক দেশের সংসদ সদস্য আরেক দেশে গিয়ে নিখোঁজ হলে সেটা আলোড়ন তোলার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু তার নৃশংস হত্যাকান্ডের খবর সেই আলোড়নে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে। যদিও বাংলাদেশ ও ভারতের পুলিশ সংসদ সদস্য আনেয়ারুল আজিম আনারের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন।

বাংলাদেশ ও ভারতে গ্রেপ্তার হওয়া চারজনের বরাতে হত্যাকান্ডের বিস্তারিত বিবরণও গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু এখনও সংসদ সদস্যের মরদেহ পাওয়া যায়নি। সন্দেহভাজন হত্যাকারীদের বরাতে জানা যাচ্ছে, সংসদ সদস্যের মরদেহ টুকরো টুকরো করে কলকাতার বিভিন্ন স্থানে ফেলে দেয়া হয়েছে। অনেক চেষ্টার পরও কলকাতা পুলিশ এখনও কিছুই উদ্ধার করতে পারেনি। মরদেহ উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত আইনের ভাষায় মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে বলা যায় না। আইনের ভাষায় যাই হোক, আনোয়ারুল আজিম আনার যে আর বেঁচে নেই, এটা মোটামুটি নিশ্চিত।

যে কোনো মৃত্যুই বেদনাদায়ক। আর টানা তিনবারের সংসদ সদস্যের এমন অপমৃত্যু আরো বেশি বেদনার। তবে আনোয়ারুল আজিম আনারের মৃত্যুর পর অনেকগুলো প্রশ্ন সামনে এসেছে। এই মৃত্যু কোনো রাজনৈতিক বিরোধের কারণে নয়। ছেলেবেলার বন্ধু আক্তারুজ্জমান শাহীনের পরিকল্পনায়ই হত্যার শিকার হয়েছেন আনোয়ারুল আজিম আনার। এখন পর্যন্ত যা খবর তাতে স্বর্ণ চোরাচালানের লেনদেন নিয়ে বিরোধের কারণেই এই হত্যাকান্ড ঘটেছে বলেই জানা যাচ্ছে। আনার চোরাচালানিদের বিরোধিতা করতে গিয়ে মারা গেছেন, এমন মহত্বের আবরণ দেয়ারও সুযোগ নেই। বরং তিনি নিজে সেই চোরাচালান সিন্ডিকেটের অন্যতম নিয়ন্ত্রক ছিলেন বলেই খবরে প্রকাশ।

টানা তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও আনারের ভাবমূর্তি কখনোই স্বচ্ছ ছিল না। নির্বাচন কমিশনে দেয়া হলফনামায় আনার নিজেই জানিয়েছিলেন, বিভিন্ন সময়ে তার বিরুদ্ধে ২১টি ফৌজদারি মামলা ছিল। ২০০৮ সাল পর্যন্ত তিনি ইন্টারপোলের ওয়ারেন্টভূক্ত ছিলেন। আওয়ামী লীড় ক্ষমতায় আসার পর ধীরে ধীরে সব মামলা থেকে তিনি অব্যাহতি পান বা মামলা বাতিল করা হয়। কাগজে-কলমে ক্লিন হওয়ার পর ২০১৪ সাল থেকে তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাচ্ছেন এবং পরপর তিনবার ঝিনাইদহ-৪ আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছেন।

কোনো উপযুক্ত আদালত কর্তৃক অপ্রকৃতিস্থ বা দেউলিয়া ঘোষিত না হলে, বিদেশী রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন না করলে এবং নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে অন্তত দুই বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়ে মুক্তিলাভের পর পাঁচ বছর অতিবাহিত না হলের ২৫ বছর বয়সী যে কেউ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হতে পারেন। সে হিসেবে আনোয়ারুল আজিম আনারের সংসদ সদস্য হতে কোনো বাধা ছিল না। কিন্তু আইনের বাইরেও কিছু নৈতিক প্রশ্ন থেকেই যায়। বাংলাদেশে স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করার সুযোগ যেমন আছে, তেমনি দলীয় মনোনয়নে নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ আছে।

সংবিধান অনুমোদন করলে যে কেউ স্বতন্ত্র নির্বাচন করতে পারেন। কিন্তু দলীয় মনোনয়ন পেতে হলে সবাইকে একটা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ-বিএনপির মত বড় দলগুলোতে প্রতিটি আসনেই নির্বাচন করার মত অনেক নেতা থাকেন। দলের মনোনয়ন পেতেও তাদের দীর্ঘ লড়াই করতে হয়। যেহেতু বিএনপি অনেকদিন ধরেই নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে, তাই এখন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পলেই জয় অনেকটা নিশ্চিত হয়ে যায়। আনোয়ারুল আজিম আনার যে তিনটি নির্বাচনে জয় পেয়েছেন, সেই তিনটি নির্বাচন নিয়েই নানা প্রশ্ন ছিল।

কোনো দলের মনোনয়নের ক্ষেত্রেই জনপ্রিয়তা একমাত্র মাপকাঠি হতে পারে না, হওয়া উচিত নয়। ভালো লোকদের বেছে নিলে আজ আওয়ামী লীগকে এই ভাবমূর্তি সঙ্কটে পড়তে হতো না। ওবায়দুল কাদের যতই আত্মপক্ষ সমর্থন করুন, পাশাপাশি তিনি যেন একটু আত্মজিজ্ঞাসাও করেন। আনার হত্যাকান্ড থেকে যেন ভবিষ্যতে শিক্ষা নেন। মনোনয়নের ব্যাপারে যেন আরো সতর্ক থাকেন। তাতে রাজনীতির ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে, সংসদের মর্যাদা বাড়বে।

অনেকদিন ধরেই একটা অভিযোগ ছিল, রাজনীতি আর রাজনীতিবিদদের হাতে নেই। ব্যবসায়ী, মাফিয়া, চোরাচালানী, অর্থশালীরাই রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করেন। তাই রাজনীতিকে পরিচ্ছন্ন রাখতে সুশীল সমাজ অনেকদিন ধরেই সৎ ও যোগ্য লোককে মনোনয়ন দেয়ার দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো সে দাবিকে খুব একটা আমলে নেয়নি। তাদের মূল লক্ষ্য জয়। যিসিন জিততে পারবেন, যার অনেক অর্থ ও পেশি শক্তি আছে; মনোনয়নের ব্যাপারে তাকেই অগ্রাধিকার দেয় দলগুলো। তবে গত তিনটি নির্বাচন যেহেতু অনেকটাই একতরফা হয়েছে তাই আওয়ামী লীগের সামনে সুযোগ ছিল, নিজের দলের সৎ, যোগ্য ও ভালো লোককে মনোনয়ন দিয়ে সংসদের মান ও মর্যাদাকে আরো উচ্চধাপে তুলে নেয়ার। কিন্তু আওয়ামী লীগ সেই আগের ধারায় অর্থ, অস্ত্র, পেশি শক্তিকেই প্রাধান্য দিয়ে মনোনয়ন দিয়েছেন। তাই রাজনীতিকে পরিচ্ছন্ন করার একটা সুবর্ণ সুযোগ আওয়ামী লীগ হেলায় হারিয়েছে।

নিছক জয় নিশ্চিত করতে গিয়ে তারা নদভীর মত জামাতি, বদির মত ইয়াবা পাচারকারীকে বারবার মনোনয়ন দিয়েছে। দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনার পর অবশ্য বদির বদলে তার স্ত্রীকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। অবশ্য এমপি না হয়েও এমপিরা ক্ষমতা প্রয়োগ করেন বদি। বদি, নদভী বা আনারের মত আরো অনেকে আছেন, যারা নানা অপকর্মে জড়িত থাকার পরেও দলের মনোনয়ন এবং পৃষ্ঠপোষকতা পান।

আনোয়ারুল আজিম আনারের মৃত্যু অবশ্যই গভীর বেদনার। কিন্তু তার মৃত্যু আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তিকেও গভীর সঙ্কটে ফেলেছে। আনারের বারবার মনোনয়ন পাওয়া নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে পড়েছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। চাইলে তিনি নিজেদের ভুল স্বীকার করতে পারতেন। কিন্তু সেটা না করে তিনি স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে আত্মপক্ষ সমর্থন করেছেন, ‘তিনি কী ছিলেন, সেটা বড় কথা নয়। তার জনপ্রিয়তা দেখেই দল তাকে মনোনয়ন দিয়েছে। সে যে এলাকার প্রতিনিধিত্ব করে, সেই এলাকা গিয়ে দেখুন, তার জন্য শোকার্ত মানুষের হাহাকার। তাকে আমরা তৃতীয়বার মনোনয়ন দিয়েছি জনপ্রিয়তা দেখে। এখন সে ভেতরে কোনো অপকর্ম করে কি না…এসব যখনই প্রমাণিত হয়, প্রধানমন্ত্রী কিন্তু জিরো টলারেন্স। অন্যায়কারী, অপরাধী দলের লোক হলেও তিনি ছাড় দেন না।’

ওবায়দুল কাদের উল্টো দায় দিয়েছেন সাংবাদিকদের, ‘আপনারা এখন বলছেন, কলকাতায় তাকে চোরাকারবারি বলছে। আমি সাংবাদিকদের বলব, তিনি তিন-তিনবার জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, তখন কি আপনারা এটা পেয়েছেন। এখন ভারতীয় সাংবাদিকেরা কোনো তথ্য আনল, সেটার উদ্ধৃতি দিচ্ছেন। আপনারা তো এই দেশের নাগরিক, সে যদি অপরাধী হয়, সেই অপরাধটা আপনাদের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে কেন এল না?’

সাংবাদিকরা কেন আগে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করলো না, সে দায় অবশ্যই গণমাধ্যমের। তবে গণমাধ্যম যদি ঠিকঠাকমত অনুসন্ধান করে তাহলে কিন্তু ঠগ বাছতে গা উজাড় হয়ে যাবে, সে বিষয়টিও যদি ওবায়দুল কাদের মাথায় রাখেন ভালো হয়। কিন্তু আওয়ামী লীগের মত একটি বড় দল মনোনয়ন দেয়ার আগে একজন মানুষের অতীত বিবেচনা করবে না, এটা হওয়া উচিত নয়। আওয়ামী লীগ বিশাল দল। তৃণমূল পর্যায়ে বিস্তৃত তাদের সংগঠন।

ঝিনাইদহ-৪ আসনে ২১ মামলার আসামী আনোয়ারুল আজিম আনার ছাড়া মনোনয়ন দেয়ার মত আর কেউ ছিলেন না, এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। জনপ্রিয়তা বিবেচনায় যদি খারাপ লোকজনই মনোনয়ন পায়, তাহলে আর ভালো লোকজন আওয়ামী লীগ করবে কেন? ওবায়দুল কাদের যে জনপ্রিয়তাকেই একমাত্র মানদন্ড বলছেন, যে তিনটি নির্বাচনে আনার মনোনয়ন পেয়েছেন ও পাস করেছেন, সে তিনটি স্বচ্ছ ইমেজের কম জনপ্রিয় লোককে মনোনয়ন দিলেও কি তার ফেল করার সুযোগ ছিল?

কোনো দলের মনোনয়নের ক্ষেত্রেই জনপ্রিয়তা একমাত্র মাপকাঠি হতে পারে না, হওয়া উচিত নয়। ভালো লোকদের বেছে নিলে আজ আওয়ামী লীগকে এই ভাবমূর্তি সঙ্কটে পড়তে হতো না। ওবায়দুল কাদের যতই আত্মপক্ষ সমর্থন করুন, পাশাপাশি তিনি যেন একটু আত্মজিজ্ঞাসাও করেন। আনার হত্যাকান্ড থেকে যেন ভবিষ্যতে শিক্ষা নেন। মনোনয়নের ব্যাপারে যেন আরো সতর্ক থাকেন। তাতে রাজনীতির ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে, সংসদের মর্যাদা বাড়বে।

আনোয়ারুল আজিম আনারের বিরুদ্ধে যত মামলাই থাকুক, দেশের প্রচলিত আইনেই সেগুলো নিষ্পত্তি হয়েছে। তার এমন নৃশংস হত্যাকান্ড তার এলাকার মানুষের মত আমাদেরও বেদনার্ত করেছে। তার এমন নিষ্ঠুর হত্যাকান্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই; খুনিদের সর্বোচ্চ সাজা যেন নিশ্চিত করা হয়।

২৬ মে, ২০২৪

লেখক : বার্তাপ্রধান, এটিএন নিউজ।

এইচআর/জিকেএস

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করা হয়। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো। বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।